মহান আল্লাহ বলেনঃ
‘তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক অবশ্যই থাকতে হবে, যারা (মানুষকে) সর্বদা পূর্ণ ও কল্যাণের দিকে ডাকবে, ভাল ও সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং মন্দ ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে; যারা এরূপ কাজ করবে, তারাই হবে সফলকাম।’ (সূরা আলে-ইমরানঃ ১০৪)
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ ‘তোমরাই সর্বোত্তম জনগোষ্ঠী (উম্মাহ), তোমাদেরকে মানবজাতির পথনির্দেশনার জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে; তোমরা ন্যায় ও পূণ্যের আদেশ করবে এবং অন্যায় ও পাপাচার থেকে বিরত রাখবে। (সূরা আলে-ইমরানঃ ১১০)
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ ‘(তোমরা) নম্রতা ও মার্জনার নীতি অবলম্বন করো, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খদের সাথে তর্কে জড়িয়ো না। (সূরা আল-আরা’ফঃ ১৯৯)
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী পরস্পরের বন্ধু ও সঙ্গী। এরা পরস্পরকে ভালো কাজের নির্দেশ দেয়, সব অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে। (সূরা তওবাঃ ৭১)
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ বনী ইসরাইলীদের মধ্য থেকে যারা কুফরীর পথ গ্রহণ করেছে, তাদের প্রতি দাউদ ও ঈসা বিন মরিয়মের ভাষায় লানত করা হয়েছে। কেননা তারা বিদ্রোহের পথ ধরেছিল এবং অত্যন্ত বাড়াবাড়ি শুরু করেছিল। তারা পরস্পরকে পাপাচার থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব পরিহার করেছিল। অতীব জঘন্য কর্মনীতিই তারা গ্রহণ করেছিল। (সূরা মায়েদাঃ ৭৮-৭৯)
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ সুতরাং হে নবী! যে জিনিসের নির্দেশ তোমাকে দেয়া হচ্ছে তা সজোরে ও উচ্চকণ্ঠে জানিয়ে দাও। এ ব্যাপারে মুশরিকদের কিছুমাত্র পরোয়া করো না। (সূরা আল হিজরঃ ৯৪)
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ আমরা এমন লোকদের বাঁচিয়ে দিলাম যারা দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকত; আর যারা জালিম ছিল তাদেরকে পাকড়াও করলাম তাদের নাফরমানীর কাজের জন্যে কঠিন শাস্তি দিয়ে। (সূরা আল আরা’ফঃ ১৬৫)
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ সুতরাং (হে নবী!) ‘লোকদের সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দাও, এ মহাসত্য তোমার প্রভুর (বব্ব-এর) নিকট থেকে এসেছে। এখন যার ইচ্ছা একে বিশ্বাস করুক আর যার ইচ্ছা অমান্য করুক। আমরা জালিমদের জন্যে দোযখের ব্যবস্থা করে রেখেছি।’ (সূরা আল-কাহাফঃ ২৯)
এ পর্যায়ের বিষযবস্তুর সাথে সঙ্গতিশীল বহু সংখ্যক আয়াত কুরআন মজীদে বিদ্যমান রয়েছে।
- হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বর্ণনা করেনঃ আমি রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তোমাদের কেউ যদি কোন পাপ কাজ সংঘটিত হতে দেখে, সে যেন তা হাত দিয়ে (শক্তি দ্বারা) বন্ধ করে দেয়। যদি সে এতে সমর্থ না হয়, তবে সে যেন মুখের (কথার) সাহায্যে (জনমত গঠন করে) তা বন্ধ করে দেয়। যদি সে এই শক্তিটুকুও না রাখে, তবে যেন অন্তরের সাহায্যে (সুপরিকল্পিতভাবে) তা বন্ধ করার চেষ্টা করে। (অর্থ্যাৎ কাজটির প্রতি ঘৃণা পোষণ করে)। আর এটা হলো ঈমানের দুর্বলতম (বা নিম্নতম) স্তর; অর্থ্যাৎ এর নীচে ঈমানের আর কোন স্তর নেই। (মুসলিম)
- হযরত ইবনে মাসউদ বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার পূর্বে যে নবীকেই কোন জাতির কাছে পাঠানো হয়েছে, তার সাহায্যের জন্য তার উম্মতের মধ্যে অবশ্যই একদল সহচর ও সাহায্যকারী থাকতো। তারা তার সুন্নাতকে কঠোরভাবে আঁকড়ে ধরতো এবং তাঁর নির্দেশাবলী মেনে চলতো, তাদের পর এমন কিছু লোকের আর্বিভাব হলো, তারা যা বলতো তা নিজেরাই মানতো না; বরং এমন কাজ করতো যা করার নির্দেশ তাদেরকে দেয়া হয়নি। অতএব, যে ব্যক্তি এ ধরনের লোকের বিরুদ্ধে হাত দিয়ে (শক্তি প্রয়োগের দ্বারা) জিহাদ করবে, সে মুমিন। যে ব্যক্তি এদের বিরুদ্ধে অন্তর দিয়ে জিহাদ করবে, সেও মুমিন। আর যে ব্যক্তি মুখ দিয়ে (মানুষকে বুঝানোর সাহায্যে) এদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে, সেও মুমিন। এরপর আর শর্ষের বীজ পরিমাণও ঈমান নেই। (মুসলিম)
- হযরত নু’মান ইবনে বশীর বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে বসবাসকারী ও সীমা অতিক্রমকারীর দৃষ্টান্ত হলোঃ একদল লোক লটারী করে জাহাজে উঠলো। তাদের কিছু সংখ্যক সঙ্গী নিজের তালায় এবং কিছু সংখ্যক উপরের তলায় স্থান পেল। নীচ তলার লোকেরা পানির প্রয়োজন হলে ওপর তলার লোকদের পাশ দিয়ে পানি আনতে যায়। তারা (নীচ তলার লোকেরা) পরস্পর বললোঃ আমরা যদি আমাদের এখান দিয়ে একটা সুড়ঙ্গ করে দেই, তবে ওপর তলার লোকদেরকে কষ্ট দেয়া থেকে রেহাই দেয়া যেত। কিন্তু এখন যদি তারা (ওপর তলার লোকেরা) তাদেরকে এ কাজ করতে অনুমতি দেয়, তবে সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তারা তাদেরকে এই কাজ করতে বাধা দেয় (অর্থ্যাৎ ছিদ্র করা থেকে বিরত রাখে), তাহলে নিজেরাও বাঁচবে এবং অন্যদেরকেও বাঁচাতে পারবে। (বুখারী)
- হযরত যয়নাব বিনতে জাহাশ (রা) বর্ণনা করেন, একদা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তাঁর কাছে এলেন। তিনি বলছিলেনঃ লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু, ধ্বংস আরবের সেই খারাবি ও অনিষ্টের কারণে, যা নিকটে এসে পড়েছে। আজ ইয়াজুজ-মাজুজের (বন্দীশালার) দরজা এতটা খুলে দেওয়া হয়েছে। (এই বলে) তিনি তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলী ও তর্জনী দিয়ে একটা বৃত্ত বানিয়ে লোকদের দেখালেন। আমি আরজ করলামঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে নেককার (খোদাভীরু) লোক উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো?’ তিনি বললেনঃ ‘হ্যাঁ, যখন অশ্লীল ও নোংরা কাজের অত্যাধিক বিস্তার ঘটবে। (বূখারী ও মুসলিম)
- হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘তোমরা রাস্তার ওপর বসা থেকে বিরত থাকো।’ সাহাবীগণ বললেনঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল! রাস্তার ওপর বসা ছাড়া তো আমাদের উপায় নেই। আমরা সেখানে বসে (পারস্পারিক প্রয়োজনে) কথাবার্তা বলে থাকি।’ রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ‘তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বিরত থাকতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছো; তাহলে রাস্তার হক আদায় করো।’ তারা বললেনঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল! ‘রাস্তার হক আবার কি?’ তিনি বললেনঃ ‘রাস্তার হক হলো— দৃষ্টি সংযত রাখা (রাস্তা থেকে) কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা, (লোকদের) সালামের জবাব দেয়া, (তাদেরকে) ভালো কাজের নির্দেশ দেয়া এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। (বুখারী ও মুসলিম)